জানি না - Partho Pratim Mazumder

জানি না - - পার্থ প্রতীম মজুমদার- 

মানুষের লেনদেন শুরু হয় অভাব থেকে। আদিম বা প্রাচীন কালে অভাব ছিলো না বললেই চলে। ফলের দরকার গাছ থেকে পেড়ে নিতো। মাছের দরকার নদী বা জলাশয় থেকে নিয়ে নিতো। কিন্ত যখন অভাব বাড়তে থাকে অর্থাৎ জায়গা জমির পরিমান সংকুচিত হতে থাকে, গাছ পালার পরিমান কমতে থাকে, তখন আসলে অভাবের কোন নির্দিস্ট সীমার মধ্যে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। কারন, আজকাল কেবল টাকা না কারোর কাছে কম্পিউটার নেই, বা নেট কানেকশন নেই এটাও অভাব। আসলে অভাব জিনিষটা যে কেবল চাহিদা মেটানোরঅনেকের ক্ষুধা নেই, বসবাসের জায়গা আছে, পুকুরে মাছ আছে, এমনকি চাষাবাদ বা দোকান এই ধরনের কিছু উৎস আছে যেখান থেকে টাকা আসতে পারে, কিন্তু দেখা যায় তাঁর মোবাইল ফোন নেই বা ইন্টারনেট বা মোবাইলে কথা বলার জন্য ব্যালেন্স নেই। এইটাও কিন্তু অভাব। অথচ আজ থেকে বিশ বছর আগে এই নামে কোন অভাবের উৎসও ছিলো না।
এখন অভাবটা কি প্রাকৃতিক নাকি মানবসৃষ্ট তা নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক করা যেতে পারে। যেমন, মানুষের ক্ষুধা লাগাটা প্রাকৃতিক, আবার চিকিৎসা প্রাকৃতিক , আবার মানবসৃষ্ট দুই দিকেই যায়। আবার মোবাইল , ইন্টারনেট এর দিক চিন্তা করে মানবসৃষ্ট। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, মানুষের যোগাযোগের ব্যাপারটা দ্রুত করার চাহিদা থেকে এই অভাবের উৎপত্তি। হাঁ, ঠিক আছে। কিন্তু মানুষের বেসিক যে সাতটি চাহিদার কথা বলা আছে সেখানে বিনোদনের কথাটি উল্লেখ নেই।
এখন কেউ যদি বলে বিনোদন মনের তৃষ্ণা দূর করে, ঠিক আছে ওকে। কিন্তু বড় ছেলে নাটকটা কি ধরনের মনের তৃষ্ণা দূর করে আমার জানা নেই। বর্ং ফেইসবুকে মনের আরও দুঃখ প্রকাশ করতে দেখলাম। আবার সাউথ ইন্ডিয়ার কাবালি ছবির জন্য রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করতে দেখেছি।
আবার মনের তৃষ্ণার ব্যাপারে যায়, তাহলে কোন একটা জিনিষে অভ্যস্ত করায় নেওয়া তারপর সেখান থেকে যোগানের পরিমান কমান দেয়ার মাধ্যমে অভাব তৈরি করা যেতে পারে- এইটা কি বললে ভুল হবে।
যেমন চা পাতা- শুনেছি যখন চীনারা সবাইকে চায়ের নেশা ধরিয়ে বিপুল পরিমান ব্যবসা করেছে। তারপর আসলো মাদক আর অস্ত্র। মাদকের নেশা কেমন যে করে কেবল সেই জানে। তারপর সেই অভাব মেটানোর জন্য প্রতিষ্ঠা হলো মাদকাসক্তি-নিরাময়-কেন্দ্র, ওইজে চিকিৎসার ব্যাপারটি চলে এসেছে।
এখন লেনদেন ব্যাপার চলে এসেছে, আধিপত্যের ব্যাপারও চলে এসেছে। অস্ত্র ছাড়া চলেই না। আর অস্ত্র চালান নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি করা হলো সশস্ত্র বাহিনী । দাঙ্গা হাঙ্গামার ব্যাপারও চলে এসেছে।
এখন বলতেই পারেন , অন্য দেশে বড় বড় ট্যাঙ্ক , মিশাইল এক্সপোর্ট ইম্পোরট করে, এখানে লোভটা কোথায়? দেশের নিরাপত্তার জন্যই তো করছে। আমি বলবো জানি না।
অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ ঠেকানো যায় কি না সেটা আমি জানি না। কারন একটা দেশের তুলনায় অস্ত্রের দিক দিয়ে এগিয়ে থাকলেও আরেক দেশের তুলনায় দুর্বল। অস্ত্র ক্ষমতা দেখালে যুদ্ধ লাগা তো সেকেন্ডের ব্যাপার, তাহলে লাগে না কেন ? যুদ্ধ লাগলে কখন লাগে? আমি বলবো জানি না।
কারন, হিরোশিমার কাহিনির পর ২০১৮-১৯ এর আগে জাপানে সামরিক বাহিনী ছিল না। এখন কিসের দরকার পড়লো? আমি বলবো জানি না।
এখন বলতে পারেন, সমস্যা বা চাহিদা তো লোভের কারণেও হয়। হ্যাঁ কথা ঠিক। যেমন অনেক খাবার প্রতি লোভ বেশি, মিষ্টি , বিরিয়ানি রান্না করলে নিজেকে আটকানো যাবে না। টাকার লোভ কম বেশি সবারই থাকে।
এখন বলতে পারেন প্রিন্টের টাকা , কাগজের টাকা - তাহলে এতো লোভ কেন? শ্রীচরন সেবায় মন দাও- এই ধরনের অনেক আধ্যাত্মিক কথা বার্তা শুনেছি। লোভ ব্যাপারটা নিয়ে পরিষ্কার করা যাক। ধরুন আপনি আজকে একশো টাকা রোজগার করলেন, ভালো কথা। আপনাকে সেই জন্য অভিনন্দন। এখন আপনি কি বসে থাকবেন। হয়, একশো টাকা আবার রোজগার করবেন আর নয়তো একটু বাড়তি করার চেষ্টা করবেন।
এখন এইটা কি লোভ বলবেন ? না, মোটেই না । বরং প্রতিযোগী বা হিংসুক বাদে প্রায় সবাই ভালো বলবে। কিন্তু আপনাকে ভালো বললেই সেই যে ভালো হবে তাঁর কোন মানে নেই, আসলে এইটা অনেক কিছু স্বার্থ - প্রতিস্বন্দিতার উপর নির্ভর করে।
আচ্ছা ,এখন যদি একশো টাকা চেয়ে বাড়তি রোজগারের জন্য অসুদপায় অবলম্বন করি সেটা কি ভালো হবে? ধরেন আপনি সবজি , মরিচ তরিতরকারি বিক্রি করেন, এখন বাড়তি রোজগারের জন্য ওজনে কম দেন বা ভেজাল মিশান সেটা কি ভালো হবে? না !! মোটেই না।
আপনার ক্ষতি হলে ব্যবসার বা জীবন চালানোর পদ্ধতি পাল্টান। এখন এই ভেজাল আপনার ছেলে মেয়ে সবাই খাচ্ছে, আপনি নিজেও খাচ্ছেন।
ব্যাপারটা কি ঠিক হলো ?
এখন বলতে পারেন ,এক দেশ আরকে দেশের মানুষকে বা নিজের দেশের মানুষকে কামান, বন্দুক , মিশাইল দিয়ে মারছে । এখানে দয়ার কি দেখেছেন? এইটা কি লোভ না ? আমি বলবো জানি না।
এখন বলতে পারেন সব জায়গায় দুর্নীতি আছে, অফিসে- বাইরে সব জায়গায়। ওরা করে কেন? এখন কি বলবেন এইটা কি চাহিদা? আরও মেধাবী মানুষ বলতে পারেন, সরকার যে ট্যাক্স বাড়িয়ে রাখে এখন এইটাকে কি বলবেন ? সরকার ইচ্ছা করলে টাকা কমিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু করে না। অনেক বলবে সম্ভব না , কারন তারল্য বেড়ে যাবে । কিন্তু এখন কোন দেশের বিনিয়োগকারি কোটি কোটি টাকা
বিনিয়োগ করলো এখন কি তারল্য বেড়ে যাবে নাকি কমবে?
যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি বলবো জানি না। কারন পুরাটা ধোঁয়াশা মনে হয়। যদি কোনদিন জানতে পারি তাহলে লিখে দিবো।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বিনিয়োগকারি ফ্লাইওভারে টাকা বিনিয়োগ করে, সেতুতে বিনিয়োগ করে, যদি কেউ ওই রাস্তা বা রুট ব্যবহার করে তাহলে সে ট্যাক্স দিবে বা টোল দিবে, আমি , আপনি দিতে যাবো কেন? সবজির দাম বাড়বে কেন? কেন সব সবজি কি ওঃই রুট দিয়েই আসে? আমি বলবো জানি না।
কেন অনেক পয়েন্ট ধরা যেতে পারে। আবার বলবে, সবজি বাজারে বেশি আসলে বা উৎপাদন বেশি হলে যেমন মৌসুমের সময় কমে যায়। এখন আপনি জিজ্ঞেস করবেন , এতো গবেষণা ইন্সটিউট , কৃষি মন্ত্রনালয় তথ্য পরিসংখ্যান করে বের করে ধানের
এতোগুলা বাম্পার ফলন হইছে। তাহলে আবার আমদানিও করে, তাহলে চাল তো পানির দরে পাওয়ার কথা। তাহলে এতো অভাবের তাড়না কেন লাগে? দাম কমে না কেন ? আমি বলবো জানি না। যে চাষ করে সেই বুঝে দাম না পেলে কেমন লাগে/অথচ প্রতিবেশি দেশ জাপানে নাকি চাল আমদানি করলেও চাষিরা ঠিক ন্যায্যমুল্য পায়, কারন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য।
হুম, এখন বড় লোক, ব্যবসায়ী সিআইপি টাইপের লোকজন বলতে পারে ধান চাষ করে কত টাকা আসে। তারচেয়ে আইটিতে দক্ষ বা শিক্ষিত হয় , চাকুরি করে মেলা টাকা আসবে। সবাই কিনে চেটেপুটে খেতে পারবো। লজিক ঠিক আছে, কিন্তু আমি কোন টাকা পাই নাই , কাজও পাই নাই । এখন প্রশ্ন দুই তিনজন চাকরি দিয়ে বড়লোক হয়ে গেলো , আরও তো বাকি আছে, তারা কি খাবে? আমি বলবো জানি না ।
এখন পাশের দেশে মন্দা লাগলে আরেক দুরের দেশ থেকে ধান আনতে হবে। তখন টাকা কি আমার কাছে বাড়তি আসবে ? নাকি সরকার টাকা দিবে?
সরকারের কাছে তো প্রিন্টের টাকা , দেয় না কেন? কিন্তু নিজের কাছে ঠিকই লাগায়, যাকে দেয় , সেও আমার আপনার মতন মানুষ।
এখন বলতে পারেন চিকিৎসার অভাবে মারা যায় কেন ? কারন সরকারের কাছে তো প্রিন্টের টাকা। সরকার ইচ্ছা করলে আপনার চিকিৎসা, পড়াশুনার খরচ ফ্রি করে দিতে পারে। দেয় না কেন? সি আইপি বা বড় ক্ষমতা শালী লোকজন যখন আপনি চাকরি না পেলে বা অভাবে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করলে বা টাকা না পেলে তারা কি চালের জন্য টাকা দেয় নাকি কাজ দেয়? আমি বলবো জানি না।
আরও উল্টা ট্যাক্স দিতে হয়। উত্তরে বলতে পারেন, সরকার নিরাপত্তা দেয় এই জন্য। আরেহ, বিজনেস করছেন আপনি, মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন, একটা ক্লাইয়েন্টও পান না , অথচ ট্যাক্স দিতে হচ্ছে, পুলিশকে খুশি করতে হচ্ছে , স্থানীয় অকথিত সরকারকে টাকা দিতে হচ্ছে। তাহলে আমার লাভটা কোথায় ? আমি বলবো জানি না।
ছোট ব্যবসায়ীর তো সরকারি পজিশন বা ক্ষমতা নেই যে আরক ছোট ব্যবসায়ীর থেকে চান্দা নেয়া যাবে।অথচ, বাংলাদেশের ছেলে মেয়েদের নাকি পটেনশিয়ালটি বেশি। হুম, কথা ঠিক, অনেকেরই প্রতিভা আছে। কিন্তু ওই গাইড লাইন আর সাপোর্টের অভাব। বেশিরভাগ ছেলে মেয়ে নিজেও জানে না সে কি করবে, অনেক সময় মাদক বা রাজনীতি মার্কেটিং এর মারপ্যাঁচে পড়ে জীবন শেষ।
আর এই অভাবকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ঘরে বাইরে কর্মস্থলে রাজনীতি।

পার্থ প্রতীম মজুমদার- 

No comments:

Post a Comment