ঢাকা পর্ব-৭ ও শেষ- Tahir Ibn Muhammad তাহির ইবনে মোহাম্মদ

ঢাকা পর্ব-৭ ও শেষ
Tahir Ibn Muhammad

আমার ও আমার পরিবারের সকলের চিকিৎসা ঢাকায় স্কয়ারে করাতাম।আমার ২ বাচ্চা এখানে হইছে। সামান্য কিছুর জন্য ও আমি এই হস্পিটাল কেই প্রথম পছন্দে নিতাম। আর এরপর ছিলো ইবনে সিনা। বাবা মা এর সকল ট্রিটমেন্ট এই দুই হস্পিটালেই হতো। বাবা ব্রেন স্ট্রোক এর রুগী,মা এর হাই বিপি,ডায়াবেটিক আছে।বাবার ও ডায়াবেটিক।তারপরও ভাল ই ছিলো সব দিক থেকেই। কোন অসুবিধা ফিল করলেই মাইক্রোবাস ভাড়া করে চলে আসতো। বাবা পাব্লিক বাসে চড়তে পারতো না ডায়াবেটিক এর কারনে।
আমার দিন খারাপ হলো বলে বাবা ও টেনশন করতো। তার দোয়া করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। আমাদের গ্রামের বাড়িতে দাদার সম্পদ বাবা তার দুই ভাই কে সমান ভাগে ভাগ করে দিছেন ভোগ করার জন্য। তাই সেখান থেকেও কোন হেল্প করতে পারছিলেন না। আমার নিজের কেনা জমি তে তো আমি ঠকেইছিই।যে মামা খালা জমি বেচেছিল তারাই প্রস্তাব দেয় ৬০ লাখ টাকার জমি ১৫ লাখে দিবো কিনা।দাম কমে গেছে বাবা,আমরা তোর উপকারের জন্য প্রস্তাব দিলাম।হাহাহহা। কি উপকার টাই না করতে চাইলো তারা। উপায় না পেয়ে একটা জমি ছেড়েও দিলাম। কারন আমার এই বিপদের সময় আমার বন্ধু পার্টনার রা ও সবাই সরে যেতে চাইলো। তবে তাদের অংশের টাকা নিয়ে।এদিকে শপের বাড়িওয়ালা টাকা পায়, ভেন্ডর টাকা পায়। সব লায়বেলিটিস আমার উপরে নিয়ে সেল ভ্যালু ধরে তাদের ভাগের অংশ দিয়ে দিলাম। তারা লাভের সময়ে ভাল ছিলো।লসের সময়েও ভাল ছিলো। আমার বন্ধু রা কেউ খারাপ ছিলো না। তবে তারা চাকুরীজীবী ছিলো। লস টানতে তাদের ও সমস্যা হয়ে যেত। আর ব্যবসায় বাবা হতে হয়, চাচা হলে ব্যবসা চলে দাঁড়ায় না।মানে হলো সন্তান যদি বাবার কোলে হাগু হিসু করে দেয় বাবা নিজেই পরিষ্কার করে।আর যদি চাচার কোলে করে তাহলে চাচায় ভাবী কে খুঁজে পরিষ্কার করানোর জন্য। প্রতিষ্ঠান গুলো ছিলো আমার কাছে সন্তানের মত। একদিন শুরুদিন থেকে আমি ই একটু একটু করে দাঁড় করিয়েছিলাম।তাই অসুস্থ অবস্থায় আমি ফেলে যেতে পারিনি। আমার পার্টনার রা ছিলেন চাচা।তাই তারা সরে যেতে পেরেছে সহজেই।
যাই হোক।বাবা আমার খরচ কমানোর জন্য ঢাকা আসা বাদ দিয়ে চিকিৎসার জন্য রাজশাহী গেলেন।শীতকালে আগে ঢাকা চলে আসতো।সেবার এলেন না।নওগাঁয় শীত বেশি পরে।তার লাঞ্চে পানি এসেগেল।শ্বাস কষ্ট শুরু হলো। গেলেন রাজশাহী। অন্যবার হলে আমিই রাগারাগি করে ঢাকা নিয়ে আসতাম। কিন্তু সেবার ভাবলাম থাক। চিকিৎসা করাক রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ এ। ৩ দিন কোন ভাল ডাঃ পেলো না। এরপর যাকে পেল সে বাবার প্রেশার কমানোর চিকিৎসা দিলো।আমার বাবার প্রেশার ছিলো না কোন কালেই। আরো কিছু বাজে সার্ভিস এর কারনে বাবার অবস্থার অবনতি হয়ে গেল।এরমধ্যেও ডাঃ, হস্পিটালের লোকজন ধান্ধা করে। সরি টু সে, আমাদের দেশের ডাঃ রা কেউ ভাল মানুষ না।এরা সেবা করে না।এরা কসাই। আমি টাকা দিয়ে যেমন সুইপার কাজে লাগাই,ডাঃ কেই সেটা মনে করেই কাজে লাগাই এখন।এতে কোন ডাঃ এর গায়ে জ্বালা লাগলে আমার কিছু বলার নাই।ডাঃ এর সম্মান কতটুকু দিতে হবে সেটা আমাকে কেউ আজ না বললেও চলবে।
বাবাকে ঢাকা নিয়ে আসলাম।সারা রাস্তা বাবার মরন যন্ত্রনা গেল। ঢাকায় বাবাকে কোন হস্পিটালে নিবো। পকেটে হাত দিয়ে দেখি ৬-৭ হাজার টাকা আছে। চারিদিকে যাদের কাছে টাকা পাই সবাই কে বললাম। কেউ ই হেল্প করলো না। বাবাকে সরকারী হৃদ রোগ ইন্সটিটিউট এ নিলাম। আজ ভাবি কেন আমি স্কয়ারের ইমার্জেন্সি তে নিলাম না।এই একটা কষ্ট আমাকে সারাজীবন তাড়া করে ফিরবে। বাবাকে পেলাম। চরম ভাবে প্রেশার ফল করেছে।নাই বললেই চলে। হস্পিটালে ফাহমিদা আলী আপার ভাইএর রেফারেন্স আর কিছু টাকা দিয়ে সিসিইউ তে একটা বেড পেলাম।বাবা আমার চরম শ্বাস কষ্টে ভুগছে তখন।একবার শুয়েপরে একবার বসে।আর আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে বাবারে আমার অনেক কষ্ট হলো এবার ঢাকা আসতে।এবার মনে হয় আর বাসায় ফিরবো না।তুই সব সামলে নিস, দোয়া করিস, সবাই কে সাথে নিয়ে চলিস, তোর খারাপ দিনে আমি ও চলে যাবো রে বাবা।কিচ্ছু করতে পারলাম না তোর জন্য।শুধু মনে রাখিস আমি তোর উপরে অনেক খুশি ছিলাম।
আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে বাবা।আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখ। বাবা কে আমি সান্তনা দিচ্ছি।কিচ্ছু হবে না।আমি আছি না। মা বাবা কে আমার হাতে তুলে দিয়ে বাসায় যেয়ে ঘুম দিছে নিশ্চিন্তে। কত বড় নির্ভরতা আমার উপরে। সাথে আমার বড় মামা আছেন। আর ছোট ভাই। ডাঃ একটু চেক করে বললেন কাছেই থাকেন যেকোন সময়ে পরে যেতে পারে আপনার বাবা। উনার বডিতে প্রেশার নাই।এরজন্য উনার এত অস্থির লাগছে। আমি ঔষধ কিনতে নিচে গেলাম।এসে দেখি বাবা বসে আছে। কিযেন দোয়া পড়ছেন। কাছে যেয়ে শুনি কালেমা,তোওবা সহ উনার জানা সকল দোয়া পড়ছেন। আমি পানি দিলাম খাবার জন্য ইশারা তে বললো পরে। এরপর দোয়া শেষ করে বললেন পানি দেও আর খুব ক্ষুধা লাগছে।আমি পানি আর সাথে থাকা বিস্কিট দিলাম।খেলো। এরপর আমাকে বললো আমাকে শোয়ায়ে দেও।আমি শোয়ায়ে দিচ্ছি আর দেখছি বাবার চোখ দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছে। মানুষ মারা গেলে সবার আগে চোখ হারিয়ে যায় কোথায় যেন। আমি হাউমাউ করে বাবা কে ডাকছি।ডাঃ এলো। বাবা শুধু দুইবার হেচকি দিলো আর দম টা বের হয়ে গেলো।
ডাঃ তার চেষ্টা শুরু করলো। কিন্তু আমি জানি বাবা আর নাই।সে মুহুর্তে ছোট ভাই এসে দাড়ালো। মনে হলো আমার ভাই আমি সবাই এতিম হয়ে গেলাম। মানুষ এত সহজে চলে যায়?? মরন এত সহজ এটা সেদিন ই জানলাম। বাবাকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। সাথে সাথে আমার বাবা মৃত মানুষ হয়ে গেল। আমি খালি ভাবছি বাবার লাশ নিয়ে যাবো কিভাবে? টাকা তো কাছে নাই বেশি। আমার খারাপ সময় আমার বাবাকে এভাবেই নিয়ে গেল।তার হায়াত ছিলো না হয়তো কিন্তু আমি তো কোন চেষ্টাই করতে পারলাম না।
রাত তখন ৩.৩০ বাজে।
মাকে কিভাবে বলবো যে বাবা নাই। কিন্তু এই কঠিন কাজ আমাকে ই করতে হবে।মামার কাছে বাবার লাশ রেখে বাসায় এলাম।মা ঘুমিয়ে ছিলো।আমাকে দেখেই বুঝে ফেললো।আমার মা অনেক শক্ত মানুষ কিন্তু সেদিন একদম শিশুর মত কান্না শুরু করলো। আমি যে কি করি?? বাবার লাশ মামা গোসল করিয়ে হুজুর দিয়ে বাসায় নিয়ে এল সকাল এর আগেই।
সকালে ঢাকার বাসায় জানাজা করিয়ে গাড়িতে করে যাত্রা শুরু হলো নওগাঁ দিকে। ৪-৫ বছর নওগাঁ তে যেতে পারিনাই ব্যবসায়ীক চাপে। বাবা রাগ করে বলতো আমি মরে গেলে তুই সময় পাবি আসার। কথা টা এমন কঠিন বাস্তব হবে বুঝিনি। আমার বড় কাকা বাবার থেকে ২২ বছরের বড় আর আমার বাবা ছিলেন সবার ছোট।অথচ আল্লাহ উনাকেই আগে নিয়ে গেলেন। আমার বিজনেস এর খারাপ সময়ে এটা ছিলো আমার সব থেকে বড় ক্ষতি। আমার সাইকোলজি পুরোই চেঞ্জ করে দিয়ে গেল আমার বাবার মৃত্যু।
আমি ই এবার পরিবারের প্রধান।এটা একটা কত বড় চাপ সেটা ফিল করি। সবাই আমার ডিসিশন এর অপেক্ষায় থাকে।ব্যবসা,পরিবার সব দিক থেকে আমি দুমড়ে মুচড়ে একাকার। এর থেকে পরিত্রানের উপায় কি সেটাই খুঁজি তখন।
আমি আমার পরিবারের সদস্য বাদে আর সকল রিলেটিভ, বন্ধুদের কে লাইফ থেকে বিদায় জানায়ে দিলাম। নতুন বন্ধু, পার্টনার দের সাথে সময় কাটাতে লাগলাম। একটু একটু করে কাজে মনোযোগী হতে চেষ্টা করতে লাগলাম। ফোকাস ঠিক করতে দিনের পর দিনে চেষ্টা করতে লাগলাম। ভয় পেতাম আমার যেন হার্ট এটাক না করে টেনশনে। হুট করে চুল দাড়ি পেকে যেতে শুরু করলো। বুঝলাম আমার টেনশন এদিকে এটাক করেছে।
এদিকে কিছু শপ ছেড়ে দিলাম সেল করে। তাতে আমার লোড কিছু কমলো। ৩ টা ফুড শপ রাখলাম। পার্টনারদের উপরে ছেড়ে দিলাম। এরমধ্যে আমার এক বোনের দায়িত্ব নিলাম ঢাকায় তার জন্য ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দেওয়ার। সেটাও করেছি সফল ভাবেই।
আমি আবার আইটি ব্যবসায় মনোযোগী হইছি। শুরু করতে বেগ পেতে হচ্ছে কিন্তু আমি ফাইটার আর স্লো স্টার্টার বাট গুড ফিনিশার।
যেটা ধরি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করি।
এখন "ভাতের দুয়ান", সিপি ফাইভ স্টার", ক্যাফে সেল্ফি", ফাইভ স্টারস চট্টলা" নামে ফুড ব্যবসা গুলো চলছে। বিকাশ ফ্লেক্সি লোডের একটা শপ চলছে, বুক পাব্লিকেশন চলছে, আই এস পি চলছে, আইটি ব্যবসা ( এটা এখনো ভালমত দাঁড় করাইতে পারিনি তবে দাঁড়িয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ) আর একটা ইকমার্স স্টার্টাপ নিয়ে প্লান করে একটু একটু করে কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।
(স্প্যারো টেকনোলোজি লি:
আমাদের সফট
ফার্স্ট ভয়েস টেকনোলোজি
ফার্স্ট ভয়েস কমুনিকেশন
ফ্লেভারস এন ফিলিংস)
ব্রাকেটে বন্ধী এই ব্যবসা গুলো আপাতত বন্ধী করেই রেখেছি। যদি সুযোগ পাই তাহলে হয়তো।আবার কোন দিন শুরু করবো।

পরিশেষে আমার এই গল্প আরো অনেক বড় করা যেত কারন লাইফ এ অভিজ্ঞতা কম তো হলো না। কিন্তু এবারের মত এখানেই শেষ করে দিচ্ছি।
আমার লাইফের অভিজ্ঞতা হয়তো আপনার কোন কাজেই আসবে না।তবে কিছু ভাল মন্দ শিক্ষা হয়তো পাবেন যা কাজেও লাগতে পারে।
source: ঢাকা পর্ব-৭ ও শেষ

No comments:

Post a Comment